Dhaka ১১:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেট্রো স্টেশনের উপরে আধুনিকতার ছাপ থাকলেও নিচে দখল ও অব্যবস্থাপনাই যেন হয়ে উঠেছে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী।

  • প্রকাশ : ০১:০৭:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

মোঃ জিল্লুর রহমান: ঢাকায় যাতায়াতের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে মেট্রোরেল। এটি সেসব চাকরিজীবী এবং নাগরিকদের জন্য আশীর্বাদ, যারা খরচের তোয়াক্কা না করে কম সময়ে এবং স্বাচ্ছন্দে রাজধানীর এক প্রাপ্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে চান। মেট্রোরেল সেসব নগরবাসীর যাতায়াতে এনেছে গতি, সাশ্রয় করছে সময়, একইসঙ্গে কমিয়েছে যানজটের ভোগান্তি।এত কিছুর পাশাপাশি ঢাকার মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর উপরের সাজসজ্জাও নজর কাড়ার মতো, রয়েছে আধুনিকতার ছাপ। প্রতিদিন যাত্রীরা ছাড়াও কৌতূহলী অনেক মানুষই মেট্রো স্টেশনগুলোতে ভিড় জমান শুধু একটু ঘুরে দেখার জন্য। কিন্তু স্টেশনগুলোর উপরে যতটা না ফিটফাট, দখলবাজিতে নিচের চিত্র ততটাই হতাশার।মিরপুর থেকে সচিবালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মেট্রো স্টেশনগুলোর ফুটপাতজুড়ে হকারদের রাজত্ব। এছাড়া রয়েছে অবৈধ পার্কিং, এলোমেলো গাড়ি, মানুষের অযাচিত ভিড়। প্রতিদিন যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ পথচারীদের। পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। ফলে মেট্রো স্টেশনের উপরে আধুনিকতার ছাপ থাকলেও নিচে দখল ও অব্যবস্থাপনাই যেন হয়ে উঠেছে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। কোথাও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কোথাও অফিসপাড়ার কর্মব্যস্ততা, কোথাও আবার হাসপাতালমুখী মানুষের ভিড়। রাজধানীর মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, আগারগাঁও, শাহবাগ ও সচিবালয় স্টেশন ঘুরে এমন বিভিন্ন চিত্র দেখা যায়।

মিরপুর-১০: রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ত স্টেশন, নিচেও থামে না মানুষের ঢল

মিরপুর-১০ স্টেশন এখন রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত পরিবহনকেন্দ্র। সকাল সাতটার পর থেকেই স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রার্থী এবং বিভিন্ন কাজে বের হওয়া মানুষের পদচারণায় পুরো এলাকা হয়ে ওঠে মুখর। স্টেশন থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে রিকশা, বাস, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি। যে যার মতো যাত্রী তুলতে ব্যস্ত। ফলে কয়েক মিনিট পরপরই সৃষ্টি হয় যানজট।স্টেশনের দুই পাশের ফুটপাতের বড় অংশ জুড়ে বসেছে অস্থায়ী দোকান। ফল, পোশাক, জুতা, চা, ফাস্টফুড, মোবাইলের আনুষঙ্গিক সামগ্রী থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে। মানুষের ভিড় থাকায় ব্যবসাও জমজমাট। তবে ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি যানবাহনের গতিও কমে যাচ্ছে।মেট্রোরেল থেকে নেমে গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের বড় অংশ রিকশার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যাত্রীর তুলনায় রিকশার সংখ্যা কম থাকলে ভাড়া নিয়ে চলে দর-কষাকষি। অনেক চালক আবার কাছের গন্তব্যে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে যাত্রীদের একাধিক রিকশার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। লোকাল বাসে ওঠার জন্যও তৈরি হয় দীর্ঘ সারি। ব্যস্ত সময়ে এসব কারণে স্টেশনের নিচের পুরো এলাকা এক ধরনের অস্থির পরিবেশে পরিণত হয়।মেট্রোরেল চালুর পর এই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে সন্ধ্যার পর দোকানপাটে ক্রেতা কম থাকত, এখন রাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা থাকে। নতুন নতুন খাবারের দোকান, কফিশপ, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ফার্মেসি এবং খুচরা ব্যবসা গড়ে উঠেছে।

এতে সুফলের পাশাপাশি সমস্যা বেড়েছে বলে মত স্থানীয়দের। তারা বলছেন, স্টেশনকে ঘিরে নির্দিষ্ট বাসস্টপ, রিকশা স্ট্যান্ড এবং হকারদের জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণ না করলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে তাদের পক্ষে সবসময় শৃঙ্খলা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে অফিস ছুটির সময় স্টেশনের নিচে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে, যা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার।এনামুল হক নামে এক পথচারী জানান, ‘মিরপুর-১০ এখন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাবে পরিণত হয়েছে। তাই এখানকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু বর্তমান যাত্রীসংখ্যা নয়, আগামী ১০ বছরের সম্ভাব্য চাহিদা মাথায় রেখেই করতে হবে। অন্যথায় মেট্রোরেলের গতি স্টেশনের নিচের বিশৃঙ্খলার কাছে অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে।’

মিরপুর-১১: আবাসিক এলাকা থেকে এখন ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র

মিরপুর-১১ স্টেশনের নিচে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে নিয়ন্ত্রিত ব্যস্ততা। মিরপুর-১০ এর মতো অতটা বিশৃঙ্খল না হলেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে মানুষের চলাচল থেমে থাকে না। আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোর বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং ছোট ব্যবসায়ীরা এই স্টেশন ব্যবহার করেন বেশি। সকাল আটটার পর অফিসগামী মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। একের পর এক ট্রেন এসে থামছে, যাত্রীরা দ্রুত বেরিয়ে পড়ছেন। কেউ রিকশায়, কেউ বাসে, আবার কেউ হেঁটেই গন্তব্যের পথে রওনা দিচ্ছেন।স্টেশনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে বদলে গেছে আশপাশের অর্থনৈতিক চিত্র। আগে যেখানে সীমিত সংখ্যক দোকান ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ, কফিশপ, ফার্মেসি, মোবাইল ফোনের দোকান, এটিএম বুথ, কুরিয়ার সেবা এবং বিভিন্ন ধরনের খুচরা ব্যবসা। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দোকানে ক্রেতাদের ভিড় থাকে।

ব্যবসায়ীদের মতে, মেট্রোরেল চালুর পর মানুষের যাতায়াত বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে বিক্রিও। অনেক উদ্যোক্তা নতুন করে ব্যবসা শুরু করেছেন শুধু স্টেশনকে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্ভাবনার কারণে।তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু সমস্যাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্টেশনের নিচে নির্দিষ্ট রিকশা স্ট্যান্ড না থাকায় চালকেরা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছেন। একই সময়ে লোকাল বাসও রাস্তার পাশেই যাত্রী ওঠানামা করায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে অফিস শুরুর আগে এবং বিকেলের দিকে স্টেশনের সামনের সড়কে ধীরগতি তৈরি হয়। অনেক পথচারী অভিযোগ করেন, ফুটপাতের কিছু অংশে অস্থায়ী দোকান বসায় নির্বিঘ্নে হাঁটা যায় না। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে তারা বেশি সমস্যায় পড়েন।

স্টেশন এলাকার আশপাশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হলেও যাত্রীদের জন্য আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি রয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকার জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি নেই। বাস ও রিকশার অপেক্ষায় অনেককে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এছাড়া গণপরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট লেন এবং যাত্রী ওঠানামার আলাদা জায়গা তৈরি করা হলে বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন নিয়মিত যাত্রীরা।আগারগাঁও: অফিসপাড়ার প্রাণকেন্দ্র

আগারগাঁও স্টেশনকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যস্ততার ধরন রাজধানীর অন্য স্টেশনগুলোর চেয়ে আলাদা। এখানে যাত্রীদের বড় অংশই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন দফতরে সেবা নিতে আসা মানুষ, চাকরিপ্রার্থী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। সকাল থেকে অফিস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত স্টেশন এলাকায় মানুষের পদচারণা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ট্রেন থেকে নেমে কেউ দ্রুত হেঁটে অফিসে যাচ্ছেন, কেউ আবার রিকশা কিংবা বাসে করে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছেন।স্টেশনের নিচে সারিবদ্ধভাবে রিকশা দাঁড়িয়ে থাকলেও অফিস সময়ে যাত্রীর চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে, অনেক সময় পর্যাপ্ত যানবাহন পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে বিভিন্ন রুটের বাস স্টেশনের সামনে থামায় যান চলাচলে ধীরগতি সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও বিপুলসংখ্যক যাত্রীর কারণে ব্যস্ত সময়ে পুরো এলাকা চাপের মধ্যে পড়ে।

আগারগাঁওকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও চোখে পড়ার মতো। দুপুরের খাবারের দোকান, কফিশপ, স্টেশনারি, ফটোকপি, ব্যাংকিং সেবা, ওষুধের দোকান এবং ছোট ছোট রেস্তোরাঁয় সারাদিনই মানুষের আনাগোনা থাকে। সরকারি অফিসকেন্দ্রিক হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা আগের তুলনায় বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, স্টেশন এলাকায় আরও সুসংগঠিত পার্কিং ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও প্রসারিত হবে।সরেজমিনে দেখা যায়, স্টেশনের নিচে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা নেই। অনেকেই ফুটপাত কিংবা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করেন। বৃষ্টির দিনে এই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। স্টেশন থেকে বের হওয়ার পর যাত্রীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা। এছাড়া সাইকেল ও মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা পার্কিং সুবিধা চালু করা গেলে ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহারকারীরাও উপকৃত হবেন বলে মত তাদের।

সামিউল আলিম মাহিন নামে এক পথচারী জানান, আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনটি ধীরে ধীরে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও পরিবহন সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় রেখে এখানকার সড়কব্যবস্থা, গণপরিবহন, পথচারী চলাচল এবং স্টেশনসংলগ্ন এলাকাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করা জরুরি। পরিকল্পনার অভাবে যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকায়ও যানজট ও ভোগান্তি আরও তীব্র হতে পারে।শাহবাগ: হাসপাতাল, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র

শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের চিত্র রাজধানীর অন্য স্টেশনগুলোর তুলনায় একেবারেই আলাদা। দেশের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাতীয় জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কারণে এখানে দিনের প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষের চলাচল থাকে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রোগী ও তাদের স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চাকরিজীবী, গবেষক, পর্যটক এবং দর্শনার্থীদের পদচারণায় পুরো এলাকা মুখরিত থাকে। মেট্রোরেল চালুর পর সেই ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। ট্রেন থেকে নেমেই যাত্রীরা দ্রুত হাসপাতাল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছুটে যান। অনেকে আবার বাস, রিকশা বা অন্য পরিবহন ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছান।

স্টেশনের নিচে দাঁড়ালে চোখে পড়ে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল। ফুটপাতে এক মুহূর্তের জন্যও ভিড় কমে না। হাসপাতালগামী রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, গণপরিবহন, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির একসঙ্গে চলাচলের কারণে ব্যস্ত সময়ে শাহবাগ মোড়ে যানবাহনের গতি অনেকটাই কমে আসে। পথচারীদের চাপও এত বেশি যে, অনেক সময় ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে হাসপাতালের রোগী ও বয়স্ক মানুষদের রাস্তা পার হতে গিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে দেখা যায়।স্থানীয় ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম জানান, মেট্রোরেল চালুর পর ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খাবারের দোকান, ফার্মেসি, বইয়ের দোকান, ফলের দোকান এবং অন্যান্য খুচরা ব্যবসায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে বর্ধিত মানুষের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

সচিবালয়: নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেও বাড়ছে চাপ

সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের পরিবেশ রাজধানীর অন্য স্টেশনগুলোর তুলনায় ভিন্ন মাত্রা বহন করে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরে সেবা নিতে আসা মানুষ এবং আশপাশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পদচারণায় এলাকাটি সরব থাকে।

তবে এই স্টেশনের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর অবস্থান। জাতীয় প্রেসক্লাবের নিকটবর্তী হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, বিক্ষোভ কর্মসূচি কিংবা মিছিলকে কেন্দ্র করে এলাকায় অতিরিক্ত মানুষের সমাগম ঘটে। ফলে অনেক সময় স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যাত্রী ও পথচারীর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।সরেজমিনে দেখা যায়, অফিস শুরু ও শেষের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসা মানুষও মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন। কোনো বড় কর্মসূচি, রাজনৈতিক সমাবেশ বা পেশাজীবী সংগঠনের কর্মসূচি থাকলে স্টেশন থেকে বের হওয়া মানুষের একটি বড় অংশকে জাতীয় প্রেসক্লাব ও তার আশপাশের এলাকায় যেতে দেখা যায়। এতে নির্দিষ্ট সময়ে স্টেশনের নিচে রিকশা, বাস ও পথচারীদের চাপ বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপর উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

স্টেশনের নিচে নতুন অর্থনীতি

পাঁচটি স্টেশন ঘিরে দেখা যায়, মেট্রোরেল শুধু মানুষের যাতায়াতের ধরন বদলায়নি, বদলে দিয়েছে আশপাশের অর্থনীতিও। রেস্তোরাঁ ও কফিশপসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে স্টেশনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচলের কারণে এসব ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটেছে। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোরেলের সেবা শুধু স্টেশনের ভেতরের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না, বরং স্টেশনের বাইরের পরিবেশ, ফুটপাত, যাত্রী চলাচলের পথ এবং সংযোগ অবকাঠামোও এক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্টেশনের বাইরে যদি হকারদের দখল, অবৈধ পার্কিং, এলোমেলো যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকে, তাহলে যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে। এতে অনেক যাত্রী বিকল্প পরিবহন বেছে নিতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মেট্রোরেলের যাত্রীসংখ্যা ও আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই স্টেশন এলাকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘যারা নিয়ম বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন, তারা যখন কার্যকরভাবে নজরদারি করেন না, তখন ধীরে ধীরে একটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এর ফলে নিয়ম প্রয়োগের পরিবর্তে অনিয়মই স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ‘চোর-পুলিশ’ খেলার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও ব্যয়বহুল গণপরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে স্টেশনের ভেতরের পাশাপাশি বাইরের এলাকাও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা ও নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।’

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘মেট্রোরেলের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে স্টেশনের আশপাশের এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাত ও জনপরিসর দখলমুক্ত রাখা জরুরি। অন্যথায় হকার ও অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম যাত্রী চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে এবং মেট্রোরেলের কার্যকারিতাও কমে যাবে।’

স্টেশনকেন্দ্রিক এলাকায় অবাধ দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ঠেকাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।

Share!
ট্যাগ :
সম্পাদকঃ টি·এ·কে আজাদ।


জনপ্রিয় সংবাদ

স্বচ্ছ,গতিশীলও জনমুখী বিচার ব্যবস্থা হয়েছে :আইনমন্ত্রী

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের ক্যাম্পে জায়গা না পাওয়ার হতাশা থেকে আত্মহননের চেষ্টা

মেট্রো স্টেশনের উপরে আধুনিকতার ছাপ থাকলেও নিচে দখল ও অব্যবস্থাপনাই যেন হয়ে উঠেছে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী।

প্রকাশ : ০১:০৭:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

মোঃ জিল্লুর রহমান: ঢাকায় যাতায়াতের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে মেট্রোরেল। এটি সেসব চাকরিজীবী এবং নাগরিকদের জন্য আশীর্বাদ, যারা খরচের তোয়াক্কা না করে কম সময়ে এবং স্বাচ্ছন্দে রাজধানীর এক প্রাপ্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে চান। মেট্রোরেল সেসব নগরবাসীর যাতায়াতে এনেছে গতি, সাশ্রয় করছে সময়, একইসঙ্গে কমিয়েছে যানজটের ভোগান্তি।এত কিছুর পাশাপাশি ঢাকার মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর উপরের সাজসজ্জাও নজর কাড়ার মতো, রয়েছে আধুনিকতার ছাপ। প্রতিদিন যাত্রীরা ছাড়াও কৌতূহলী অনেক মানুষই মেট্রো স্টেশনগুলোতে ভিড় জমান শুধু একটু ঘুরে দেখার জন্য। কিন্তু স্টেশনগুলোর উপরে যতটা না ফিটফাট, দখলবাজিতে নিচের চিত্র ততটাই হতাশার।মিরপুর থেকে সচিবালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মেট্রো স্টেশনগুলোর ফুটপাতজুড়ে হকারদের রাজত্ব। এছাড়া রয়েছে অবৈধ পার্কিং, এলোমেলো গাড়ি, মানুষের অযাচিত ভিড়। প্রতিদিন যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ পথচারীদের। পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। ফলে মেট্রো স্টেশনের উপরে আধুনিকতার ছাপ থাকলেও নিচে দখল ও অব্যবস্থাপনাই যেন হয়ে উঠেছে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। কোথাও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কোথাও অফিসপাড়ার কর্মব্যস্ততা, কোথাও আবার হাসপাতালমুখী মানুষের ভিড়। রাজধানীর মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, আগারগাঁও, শাহবাগ ও সচিবালয় স্টেশন ঘুরে এমন বিভিন্ন চিত্র দেখা যায়।

মিরপুর-১০: রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ত স্টেশন, নিচেও থামে না মানুষের ঢল

মিরপুর-১০ স্টেশন এখন রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত পরিবহনকেন্দ্র। সকাল সাতটার পর থেকেই স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রার্থী এবং বিভিন্ন কাজে বের হওয়া মানুষের পদচারণায় পুরো এলাকা হয়ে ওঠে মুখর। স্টেশন থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে রিকশা, বাস, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি। যে যার মতো যাত্রী তুলতে ব্যস্ত। ফলে কয়েক মিনিট পরপরই সৃষ্টি হয় যানজট।স্টেশনের দুই পাশের ফুটপাতের বড় অংশ জুড়ে বসেছে অস্থায়ী দোকান। ফল, পোশাক, জুতা, চা, ফাস্টফুড, মোবাইলের আনুষঙ্গিক সামগ্রী থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে। মানুষের ভিড় থাকায় ব্যবসাও জমজমাট। তবে ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি যানবাহনের গতিও কমে যাচ্ছে।মেট্রোরেল থেকে নেমে গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের বড় অংশ রিকশার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যাত্রীর তুলনায় রিকশার সংখ্যা কম থাকলে ভাড়া নিয়ে চলে দর-কষাকষি। অনেক চালক আবার কাছের গন্তব্যে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে যাত্রীদের একাধিক রিকশার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। লোকাল বাসে ওঠার জন্যও তৈরি হয় দীর্ঘ সারি। ব্যস্ত সময়ে এসব কারণে স্টেশনের নিচের পুরো এলাকা এক ধরনের অস্থির পরিবেশে পরিণত হয়।মেট্রোরেল চালুর পর এই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে সন্ধ্যার পর দোকানপাটে ক্রেতা কম থাকত, এখন রাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা থাকে। নতুন নতুন খাবারের দোকান, কফিশপ, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ফার্মেসি এবং খুচরা ব্যবসা গড়ে উঠেছে।

এতে সুফলের পাশাপাশি সমস্যা বেড়েছে বলে মত স্থানীয়দের। তারা বলছেন, স্টেশনকে ঘিরে নির্দিষ্ট বাসস্টপ, রিকশা স্ট্যান্ড এবং হকারদের জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণ না করলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে তাদের পক্ষে সবসময় শৃঙ্খলা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে অফিস ছুটির সময় স্টেশনের নিচে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে, যা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার।এনামুল হক নামে এক পথচারী জানান, ‘মিরপুর-১০ এখন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাবে পরিণত হয়েছে। তাই এখানকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু বর্তমান যাত্রীসংখ্যা নয়, আগামী ১০ বছরের সম্ভাব্য চাহিদা মাথায় রেখেই করতে হবে। অন্যথায় মেট্রোরেলের গতি স্টেশনের নিচের বিশৃঙ্খলার কাছে অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে।’

মিরপুর-১১: আবাসিক এলাকা থেকে এখন ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র

মিরপুর-১১ স্টেশনের নিচে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে নিয়ন্ত্রিত ব্যস্ততা। মিরপুর-১০ এর মতো অতটা বিশৃঙ্খল না হলেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে মানুষের চলাচল থেমে থাকে না। আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোর বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং ছোট ব্যবসায়ীরা এই স্টেশন ব্যবহার করেন বেশি। সকাল আটটার পর অফিসগামী মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। একের পর এক ট্রেন এসে থামছে, যাত্রীরা দ্রুত বেরিয়ে পড়ছেন। কেউ রিকশায়, কেউ বাসে, আবার কেউ হেঁটেই গন্তব্যের পথে রওনা দিচ্ছেন।স্টেশনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে বদলে গেছে আশপাশের অর্থনৈতিক চিত্র। আগে যেখানে সীমিত সংখ্যক দোকান ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ, কফিশপ, ফার্মেসি, মোবাইল ফোনের দোকান, এটিএম বুথ, কুরিয়ার সেবা এবং বিভিন্ন ধরনের খুচরা ব্যবসা। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দোকানে ক্রেতাদের ভিড় থাকে।

ব্যবসায়ীদের মতে, মেট্রোরেল চালুর পর মানুষের যাতায়াত বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে বিক্রিও। অনেক উদ্যোক্তা নতুন করে ব্যবসা শুরু করেছেন শুধু স্টেশনকে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্ভাবনার কারণে।তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু সমস্যাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্টেশনের নিচে নির্দিষ্ট রিকশা স্ট্যান্ড না থাকায় চালকেরা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছেন। একই সময়ে লোকাল বাসও রাস্তার পাশেই যাত্রী ওঠানামা করায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে অফিস শুরুর আগে এবং বিকেলের দিকে স্টেশনের সামনের সড়কে ধীরগতি তৈরি হয়। অনেক পথচারী অভিযোগ করেন, ফুটপাতের কিছু অংশে অস্থায়ী দোকান বসায় নির্বিঘ্নে হাঁটা যায় না। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে তারা বেশি সমস্যায় পড়েন।

স্টেশন এলাকার আশপাশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হলেও যাত্রীদের জন্য আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি রয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকার জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি নেই। বাস ও রিকশার অপেক্ষায় অনেককে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এছাড়া গণপরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট লেন এবং যাত্রী ওঠানামার আলাদা জায়গা তৈরি করা হলে বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন নিয়মিত যাত্রীরা।আগারগাঁও: অফিসপাড়ার প্রাণকেন্দ্র

আগারগাঁও স্টেশনকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যস্ততার ধরন রাজধানীর অন্য স্টেশনগুলোর চেয়ে আলাদা। এখানে যাত্রীদের বড় অংশই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন দফতরে সেবা নিতে আসা মানুষ, চাকরিপ্রার্থী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। সকাল থেকে অফিস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত স্টেশন এলাকায় মানুষের পদচারণা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ট্রেন থেকে নেমে কেউ দ্রুত হেঁটে অফিসে যাচ্ছেন, কেউ আবার রিকশা কিংবা বাসে করে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছেন।স্টেশনের নিচে সারিবদ্ধভাবে রিকশা দাঁড়িয়ে থাকলেও অফিস সময়ে যাত্রীর চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে, অনেক সময় পর্যাপ্ত যানবাহন পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে বিভিন্ন রুটের বাস স্টেশনের সামনে থামায় যান চলাচলে ধীরগতি সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও বিপুলসংখ্যক যাত্রীর কারণে ব্যস্ত সময়ে পুরো এলাকা চাপের মধ্যে পড়ে।

আগারগাঁওকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও চোখে পড়ার মতো। দুপুরের খাবারের দোকান, কফিশপ, স্টেশনারি, ফটোকপি, ব্যাংকিং সেবা, ওষুধের দোকান এবং ছোট ছোট রেস্তোরাঁয় সারাদিনই মানুষের আনাগোনা থাকে। সরকারি অফিসকেন্দ্রিক হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা আগের তুলনায় বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, স্টেশন এলাকায় আরও সুসংগঠিত পার্কিং ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও প্রসারিত হবে।সরেজমিনে দেখা যায়, স্টেশনের নিচে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা নেই। অনেকেই ফুটপাত কিংবা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করেন। বৃষ্টির দিনে এই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। স্টেশন থেকে বের হওয়ার পর যাত্রীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা। এছাড়া সাইকেল ও মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা পার্কিং সুবিধা চালু করা গেলে ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহারকারীরাও উপকৃত হবেন বলে মত তাদের।

সামিউল আলিম মাহিন নামে এক পথচারী জানান, আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনটি ধীরে ধীরে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও পরিবহন সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় রেখে এখানকার সড়কব্যবস্থা, গণপরিবহন, পথচারী চলাচল এবং স্টেশনসংলগ্ন এলাকাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করা জরুরি। পরিকল্পনার অভাবে যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকায়ও যানজট ও ভোগান্তি আরও তীব্র হতে পারে।শাহবাগ: হাসপাতাল, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র

শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের চিত্র রাজধানীর অন্য স্টেশনগুলোর তুলনায় একেবারেই আলাদা। দেশের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাতীয় জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কারণে এখানে দিনের প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষের চলাচল থাকে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রোগী ও তাদের স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চাকরিজীবী, গবেষক, পর্যটক এবং দর্শনার্থীদের পদচারণায় পুরো এলাকা মুখরিত থাকে। মেট্রোরেল চালুর পর সেই ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। ট্রেন থেকে নেমেই যাত্রীরা দ্রুত হাসপাতাল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছুটে যান। অনেকে আবার বাস, রিকশা বা অন্য পরিবহন ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছান।

স্টেশনের নিচে দাঁড়ালে চোখে পড়ে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল। ফুটপাতে এক মুহূর্তের জন্যও ভিড় কমে না। হাসপাতালগামী রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, গণপরিবহন, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির একসঙ্গে চলাচলের কারণে ব্যস্ত সময়ে শাহবাগ মোড়ে যানবাহনের গতি অনেকটাই কমে আসে। পথচারীদের চাপও এত বেশি যে, অনেক সময় ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে হাসপাতালের রোগী ও বয়স্ক মানুষদের রাস্তা পার হতে গিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে দেখা যায়।স্থানীয় ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম জানান, মেট্রোরেল চালুর পর ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খাবারের দোকান, ফার্মেসি, বইয়ের দোকান, ফলের দোকান এবং অন্যান্য খুচরা ব্যবসায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে বর্ধিত মানুষের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

সচিবালয়: নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেও বাড়ছে চাপ

সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের পরিবেশ রাজধানীর অন্য স্টেশনগুলোর তুলনায় ভিন্ন মাত্রা বহন করে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরে সেবা নিতে আসা মানুষ এবং আশপাশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পদচারণায় এলাকাটি সরব থাকে।

তবে এই স্টেশনের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর অবস্থান। জাতীয় প্রেসক্লাবের নিকটবর্তী হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, বিক্ষোভ কর্মসূচি কিংবা মিছিলকে কেন্দ্র করে এলাকায় অতিরিক্ত মানুষের সমাগম ঘটে। ফলে অনেক সময় স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যাত্রী ও পথচারীর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।সরেজমিনে দেখা যায়, অফিস শুরু ও শেষের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসা মানুষও মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন। কোনো বড় কর্মসূচি, রাজনৈতিক সমাবেশ বা পেশাজীবী সংগঠনের কর্মসূচি থাকলে স্টেশন থেকে বের হওয়া মানুষের একটি বড় অংশকে জাতীয় প্রেসক্লাব ও তার আশপাশের এলাকায় যেতে দেখা যায়। এতে নির্দিষ্ট সময়ে স্টেশনের নিচে রিকশা, বাস ও পথচারীদের চাপ বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপর উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

স্টেশনের নিচে নতুন অর্থনীতি

পাঁচটি স্টেশন ঘিরে দেখা যায়, মেট্রোরেল শুধু মানুষের যাতায়াতের ধরন বদলায়নি, বদলে দিয়েছে আশপাশের অর্থনীতিও। রেস্তোরাঁ ও কফিশপসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে স্টেশনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচলের কারণে এসব ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটেছে। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোরেলের সেবা শুধু স্টেশনের ভেতরের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না, বরং স্টেশনের বাইরের পরিবেশ, ফুটপাত, যাত্রী চলাচলের পথ এবং সংযোগ অবকাঠামোও এক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্টেশনের বাইরে যদি হকারদের দখল, অবৈধ পার্কিং, এলোমেলো যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকে, তাহলে যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে। এতে অনেক যাত্রী বিকল্প পরিবহন বেছে নিতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মেট্রোরেলের যাত্রীসংখ্যা ও আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই স্টেশন এলাকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘যারা নিয়ম বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন, তারা যখন কার্যকরভাবে নজরদারি করেন না, তখন ধীরে ধীরে একটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এর ফলে নিয়ম প্রয়োগের পরিবর্তে অনিয়মই স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ‘চোর-পুলিশ’ খেলার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও ব্যয়বহুল গণপরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে স্টেশনের ভেতরের পাশাপাশি বাইরের এলাকাও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা ও নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।’

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘মেট্রোরেলের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে স্টেশনের আশপাশের এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাত ও জনপরিসর দখলমুক্ত রাখা জরুরি। অন্যথায় হকার ও অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম যাত্রী চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে এবং মেট্রোরেলের কার্যকারিতাও কমে যাবে।’

স্টেশনকেন্দ্রিক এলাকায় অবাধ দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ঠেকাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।

Share!