মোঃ কবির হোসেন: বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ও নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি (মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট বা এমপিএস) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির লক্ষ্য, আগামী ছয় মাসে ৬.৮ শতাংশ হারে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বাড়বে।
অন্যদিকে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। এটি বর্তমান বিএনপি সরকার এবং গভর্নরের প্রথম মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির বিস্তারিত তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য মতে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। কিন্তু জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চলমান সান্মাষিকে সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই লক্ষ্য কোনো মাসেই অর্জিত হয়নি। এবার আগামী ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত ৬.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
কারণ নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ঋণের উচ্চ সুদহার বজায় রেখেই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে কেন্দ্রী ব্যাংক। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে, তার একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে দুইবার (জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য) মুদ্রানীতি ঘোষণা করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেয়। এমন পরিস্থিতিতে নীতিগত সুদহার অপরিবর্তিত রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সরকারের লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও এখন মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় দুই শতাংশ বেশি রয়েছে।
গত মে মাসে দেশের সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এদিকে চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে আন্তঃব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে টাকা রাখার ক্ষেত্রে এ সুদহার প্রযোজ্য হয়। নতুন মুদ্রানীতিতে এটি অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘আমরা একদিকে যেমন নীতি সুদহার ১০ শতাংশ স্থির রেখেছি, অন্যদিকে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান কমিয়ে ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং ব্যাংকগুলো চাইলেও আর বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। তাছাড়া ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এই টাকাগুলো গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছালে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়বে। আর এ কারণেই জাতীয় প্রবৃদ্ধিও বাড়বে, আবার মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
খেলাপি ঋণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মোট তিন স্তরে ১৮ মাসের একটি এনপিএল প্ল্যান নিয়েছি। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসে এক্সিট প্ল্যান, দ্বিতীয় ছয় মাসে অর্থঋণ আদালত আইন এবং তৃতীয় স্তরে ডিসট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট বাস্তবায়ন করতে চাই। এর ফলে দেশের খেলাপি ঋণ কমে আসবে। শুধু কমে আসবে না, ব্যাংক খাতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বাজার ব্যবস্থাপনা খারাপ হলে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ চ্যানেল ঠিক রাখার দায়িত্ব সরকারের। তারা যদি ওইগুলো ঠিক রাখতে পারে, তাহলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমবে। যেহেতু ওগুলো আমাদের হাতে নেই, তাই আমরা আমাদের অস্ত্র ব্যবহার করছি নীতি সুদহার উচ্চ রেখে।’
















